সভ্যতার আদিকাল থেকে মানুষের গতি ও যোগাযোগের আকুলতা তাকে চাকা আবিষ্কারে উদ্বুদ্ধ করেছিল। পশুবাহিত যান থেকে শুরু করে বাষ্পীয় ইঞ্জিন, অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন (Internal Combustion Engine), আর আজকের ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত স্বয়ংক্রিয় গাড়ি—প্রযুক্তির এই বিবর্তন আসলে মানুষের দূরত্বকে জয় করার এবং জীবনকে গতিশীল করার এক সুদীর্ঘ বৈজ্ঞানিক অভিযাত্রা। চাকার ঘূর্ণন কেবল যন্ত্রের সচলতা নয়, তা মানব সভ্যতার অগ্রগতির চাকাটিকেও বিশ্বজুড়ে ঘুরিয়ে দিয়েছে।
আমার কাছে অটোমোটিভ প্রকৌশল বা অটোমোবাইল বিদ্যা কেবল কিছু নাট-বল্টু, ইঞ্জিন, গ্রিজ বা মেকানিকের কাজ নয়। অটোমোটিভ হলো পদার্থবিজ্ঞান, থার্মোডাইনামিক্স, ইলেকট্রনিক্স, শিল্পনান্দনিকতা এবং নিরাপত্তা প্রযুক্তির এক চমৎকার সমন্বয়—যা যুগ যুগ ধরে অর্জিত প্রকৌশল প্রজ্ঞার (Wisdom) দৃশ্যমান রূপ। একটি আধুনিক যানবাহন কেবল মানুষকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায় না, বরং তা অর্থনীতির গতি সচল রাখে, সরবরাহ শৃঙ্খল টিকিয়ে রাখে এবং মানুষের জীবনকে নিরাপদ ও সহজতর করে। তাই অটোমোটিভ শিক্ষা কেবল মেকানিক্সের পাঠ নয়; এটি প্রযুক্তি, মানব নিরাপত্তা, পরিবেশ সচেতনতা ও টেকসই গতিশীলতাকে (Mobility) একসূত্রে বাঁধার এক গভীর সাধনা।
ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো অটোমোটিভ প্রকৌশলী, অটোমোবাইল ডিজাইনার বা কারিগরি বিশেষজ্ঞ নই; গাড়ির ইঞ্জিনের জটিল টেকনিক্যাল বিদ্যা বা ওয়ার্কশপের প্রথাগত মেকানিক্স আমার জানা নেই। তবে প্রযুক্তি ও প্রকৌশলের একজন অনুরাগী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে উপলব্ধি করেছি—আমাদের দেশের তরুণদের মাঝে মেধা ও ব্যবহারিক দক্ষতার কোনো ঘাটতি নেই। ঘাটতি শুধু সেই প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তির, যা তাদের মেধাকে আন্তর্জাতিক মানের অটোমোটিভ থিওরি, ইভি টেকনোলজি, অটোমেশন, কার ইলেকট্রনিক্স ও টেকসই ডিজাইনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে।
ঠিক এই চিন্তা থেকেই ‘অটোমোটিভ গুরুকুল’ (automotive.gurukul.edu.bd)-এর যাত্রা। আমি চাই, এখানে আমাদের তরুণেরা অটোমোটিভ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মৌলিক তত্ত্ব, ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স এবং বিশ্বমানের আধুনিক প্রযুক্তির জ্ঞান অর্জন করুক। প্রথাগত ফুয়েল ইঞ্জিন থেকে শুরু করে আধুনিক ইলেকট্রিক যান (EV), হাইব্রিড প্রযুক্তি, অটোমোটিভ সফটওয়্যার এবং টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা—সবকিছুর পেছনের বিজ্ঞান ও কৌশলকে তারা যেন তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয়ভাবেই অনুধাবন করতে পারে, তেমনই একটি উন্মুক্ত ও চর্চামুখী প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
আজকের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অটোমোটিভ অ্যান্ড ট্রান্সপোর্টেশন ইন্ডাস্ট্রি হলো অন্যতম বৃহৎ ও দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্ষেত্র। বিশ্বজুড়ে আজ সবুজ প্রযুক্তি ও ইলেকট্রিক গাড়ির যে বিপ্লব ঘটছে, তাতে দক্ষ অটোমোটিভ প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ানের চাহিদা সীমাহীন। আমাদের তরুণেরা যদি আধুনিক অটোমোটিভ প্রযুক্তি ও কৌশল সঠিকভাবে আয়ত্ত করতে পারে, তবে তা শুধু দেশীয় শিল্প ও পরিবহন খাতকে শক্তিশালী করবে না, বরং বৈশ্বিক অটোমোটিভ শিল্পেও বাংলাদেশের তরুণদের জন্য সম্ভাবনাময় আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলে দেবে।
রাতারাতি আমাদের দেশের অটোমোটিভ খাত বা প্রযুক্তির চিত্র বদলে দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়, আমি জানি। তবে প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পেছনে থাকে একটি ছোট উদ্যোগ। ‘অটোমোটিভ গুরুকুল’ সেই সুদীর্ঘ পথেরই এক বিনীত পদক্ষেপ—যেখানে অটোমোটিভ বিদ্যাকে দেখা হবে প্রযুক্তিকে জানার, প্রকৌশল প্রজ্ঞাকে লালন করার এবং এক আধুনিক, নিরাপদ ও গতিশীল ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে।
তবে আগের মতোই একটি সত্য অকপটে স্বীকার করতে চাই—আমি হয়তো কেবল এই উদ্যোগের সূচনাটুকু করলাম, কিন্তু একে কাঙ্ক্ষিত একাডেমিক, টেকনিক্যাল ও শিল্প-উপযোগী উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া আমার একার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমার নিজের কাজের ক্ষেত্র ও আগ্রহের পরিধি অত্যন্ত বিচিত্র ও ছড়ানো-ছিটানো—যা আমার একটি বড় ব্যক্তিগত দুর্বলতা। নানামুখী ভাবনায় মন ছড়িয়ে থাকার কারণে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘদিন টানা পুরো মনোযোগ ধরে রাখা আমার একটা স্বভাবজাত সীমাবদ্ধতা। তাই কেবল আমাকে দিয়ে এই প্রযুক্তিগত আয়োজন খুব বেশি দূর এগোতে পারবে না।
তাই দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত অটোমোটিভ প্রকৌশলী, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, অটোমোবাইল শিল্পোদ্যোক্তা, গবেষক ও কারিগরি বিশেষজ্ঞদের প্রতি আমার সশ্রদ্ধ আহ্বান—আপনারা এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হোন, এর শিক্ষাক্রম ও গবেষণায় দিকনির্দেশনা দিন এবং ‘অটোমোটিভ গুরুকুল’-কে নিজেদের প্রতিষ্ঠান ভেবে আপন করে নিন। আপনাদের অভিজ্ঞ হাত, সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ও প্রকৌশল প্রজ্ঞার আলোতেই এই স্বপ্ন পূর্ণতা পাক এবং কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে যাক।
— সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর
প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা,
অটোমোটিভ গুরুকুল
